Showing posts with label নির্মলেন্দু গুণ. Show all posts
Showing posts with label নির্মলেন্দু গুণ. Show all posts

November 11, 2011

আবার যখনই দেখা হবে | নির্মলেন্দু গুণ

আবার যখনই দেখা হবে
নির্মলেন্দু গুণ
************************

আবার যখনই দেখা হবে, আমি প্রথম সুযোগেই
বলে দেব স্ট্রেটকাটঃ ‘ভালোবাসি’।
এরকম সত্য-ভাষণে যদি কেঁপে ওঠে,
অথবা ঠোঁটের কাছে উচ্চারিত শব্দ থেমে যায়,
আমি নখাগ্রে দেখাবো প্রেম, ভালোবাসা, বক্ষ চিরে
তোমার প্রতিমা। দেয়ালে টাঙ্গানো কোন প্রথাসিদ্ধ
দেবীচিত্র নয়, রক্তের ফ্রেমে বাঁধা হৃদয়ের কাচে
দেখবে নিজের মুখে ভালোবাসা ছায়া ফেলিয়াছে।

এরকম উন্মোচনে যদি তুমি আনুরাগে মুর্ছা যেতে চাও
মূর্ছা যাবে, জাগাবো না, নিজের শরীর দিয়ে কফিন বানাবো।

‘ভালোবাসি’ বলে দেব স্ট্রেটকাট, আবার যখনই দেখা হবে।

চির অনাবৃতা হে নগ্নতমা | নির্মলেন্দু গুণ

চির অনাবৃতা হে নগ্নতমা
নির্মলেন্দু গুণ
********************

চির অনাবৃতা হে নগ্নতমা
নদীর জল তোমাকে যেভাবে পেয়েছে
আমি সেভাবে পাই নি!

লাক্স সাবান যেভাবে তোমাকে ছুঁয়েছে
আমি সেভাবে ছুঁইনি।
মেডলিন লিপস্টিক যেভাবে তোমাকে চুমু খেয়েছে
আমি সে সুযোগ পাই নি।

প্রসাধন ঘরের চারদেয়াল তোমাকে যেভাবে দেখেছে
আমি সেভাবে তোমাকে দেখিনি।
গাঢ় অন্ধকার যেভাবে তোমাকে আলিঙ্গন করেছে
আমি তো তা পারি নি।

দিনের আলো যেভাবে তোমাকে দূরে সরিয়েছে
আমি সে প্রশ্রয় পাই নি
বেসিনের জল যেভাবে তোমার হাত ধরেছে
আমি সে সুযোগও পাই নি

তোমার হাতের বই বুক পর্যন্ত যেভাবে গড়িয়েছে
দেখে তো আমার ঈর্ষাই হয়েছে
এভাবে স্পর্শকাতর কবি ঈর্ষাকাতর হয়েছে
করেছে ভ্রমণ স্বপ্নের ভিতর
ঘুরেছে ঘোরে ঘোর ঘোরতর।

ম্যাক্সির ভিতর যেভাবে তুমি ঢুকেছো
আমার আলিঙ্গনে সেভাবে তুমি আসো নি
রাতের আকাশ যেভাবে তোমাকে দেখেছে
বৃষ্টির জল যেভাবে তোমাকে জড়িয়েছে
দিনের সূর্য যে উত্তাপ তোমাকে দিয়েছে
তোমার শরীরে পৃথিবীর পরে
আমি সে সুযোগ পাই নি।

ভোরের বায়ু তোমার এলায়িত চুলে
যেভাবে হাত বুলিয়েছে
এই কবি কি সে সুযোগ পেয়েছে?
ভিনদেশী পারফিউম তোমার গাঁয়ে যেভাবে গন্ধ মেখেছে
এই কবি কি তা পেরেছে?

পূর্ণিমার মধ্যে মৃত্যু । নির্মলেন্দু গুন

পূর্ণিমার মধ্যে মৃত্যু
নির্মলেন্দু গুন

**********************

একদিন চাঁদ উঠবে না, সকাল দুপুরগুলো
মৃতচিহ্নে স্থির হয়ে রবে;
একদিন অন্ধকার সারা বেলা প্রিয় বন্ধু হবে,
একদিন সারাদিন সূর্য উঠবে না।

একদিন চুল কাটতে যাব না সেলুনে
একদিন নিদ্রাহীন চোখে পড়বে ধুলো।
একদিন কালো চুলগুলো খ’সে যাবে,
কিছুতেই গন্ধরাজ ফুল ফুটবে না।

একদিন জনসংখ্যা কম হবে এ শহরে,
ট্রেনের টিকিট কেটে
একটি মানুষ কাশবনে গ্রামে ফিরবে না।
একদিন পরাজিত হবো।

একদিন কোথাও যাব না, শূন্যস্থানে তুমি
কিম্বা অন্য কেউ বসে থেকে বাড়াবে বয়স।
একদিন তোমাকে শাসন করা অসম্ভব ভেবে
পূর্ণিমার রাত্রে মরে যাব।

একদিন সারাদিন কোথাও যাব না।

টেলিফোনে প্রস্তাব | নির্মলেন্দু গুন

টেলিফোনে প্রস্তাব
নির্মলেন্দু গুন

**************************************

আমি জানি, আমাদের কথার ভিতরে এমন কিছুই নেই,
অনর্থ করলেও যার সাহায্যে পরস্পরের প্রতি আমাদের
দুর্বলতা প্রমাণ করা সম্ভব। আমিও তো তোমার মতোই
অসম্পর্কিত-জ্ঞানে এতদিন উপস্থাপন করেছি আমাকে।
তুমি যখন টেলিফোন হয়ে প্রবেশ করেছো আমার কর্ণে-
আমার অপেক্ষাকাতর হৃৎপিণ্ডের সামান্য কম্পনও আমি
তোমাকে বুঝতে দিই নি। দুর্বলতা ধরা পড়ে যায় পাছে।

তুমিও নিষ্ঠুর কম নও, তুমি বুঝতে দাওনা কিছু। জানি,
আমার কাছেই তুমি শিখেছিলে এই লুকোচুরি করা খেলা।
কিন্তু এখন, যখন ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে আমাদের বেলা,
তখন ভেতরের চঞ্চলতাকে আমরা আর কতটা লুকাবো?
অস্ত যাবার আগে প্রবল সূর্যও চুম্বন করে পর্বত শিখর,
আর আমরা তো দুর্বল মানুষ, মিলনে বিশ্বাসী নর-নারী।
কার ভয়ে, কী প্রয়োজনে আমরা তাহলে শামুকের মতো
স্পর্শমাত্র ভিতরে লুকাই আমাদের পল্লবিত বাসনার শূঁড়।

তার চেয়ে চল এক কাজ করি, তুমি কান পেতে শোনো,
তুমি শুধু শোনো, আর আমি শুধু বলি, বলি, ভালবাসি।

উল্টোরথ | নির্মলেন্দু গুন

উল্টোরথ
নির্মলেন্দু গুন
*************************

শুধু চোখে নয়, হাত দিয়ে হাত,
মুখ দিয়ে মুখ, বুক দিয়ে বুক ;
ঠোঁট দিয়ে ঠোঁট খোলো, এইভাবে
খুলে খুলে তোমাকে দেখাও ।
শুধু চোখে নয়, নখ দিয়ে নখ,
চুল দিয়ে চুল, আঙুলে আঙুল;
হাঁটু দিয়ে হাঁটু, উরু দিয়ে উরু,
আর এটা দিয়ে ওটাকে ঠেকাও ।

শুধু চোখে নয়, চোখে চোখে চোখ,
বাহু দিয়ে বাহু, নাভি দিয়ে নাভি;
চাবি দিয়ে তালা খোলা দেখিয়াছি,
তালা দিয়ে খোলো দেখি চাবি ?

আমেরিকা: আপডেটেড | নির্মলেন্দু গুন

আমেরিকা: আপডেটেড
নির্মলেন্দু গুন
******************************


আমেরিকা, কলম্বাস কর্তৃক আবিস্কৃত
হে মহান গণতন্ত্রের দেশ -,
মানবাধিকারের হে অতন্দ্র প্রহরী!
তোমাকে সালাম, তোমাকে নমস্কার।

আমেরিকা, – আমি ভেবেছিলাম ,
সোভিয়েত ইঊনিয়নহীন পৃথিবীতে
তুমি আরো দায়িত্বশীল হয়ে উঠবে।
তোমার দৈত্যদন্তগুলো ফেলে দিয়ে,
ক্রমশ মানুষ হয়ে উঠবে তুমি।

মানুষ কেন তার নিজ জীবনের চেয়ে
ভালোবাসবে তোমার ক্ষতিকে?
ভেবেছিলাম, ১১ সেপ্টেম্বরের পর,
ঘৃণার উৎস সন্ধানে ব্রতী হবে তুমি।
আমি ভেবেছিলাম, তুমি অতঃপর
আত্মঘাতী প্রাণের গভীরে প্রবেশ করে
বুঝতে চেষ্টা করবে তার ব্যথা।

কিন্তু আমেরিকা, শক্তিমদমত্ত বিশ্বপ্রভু,
ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহন না করে,
ইতিহাসকেই শিক্ষা দিতে চাইছ তুমি।
তাই, তোমার সন্দেহতাড়িত শক্তি,
অঢেল সম্পদের দম্ভ তোমার দৃষ্টিকে
আচ্ছন্ন করেছে, মদ যে রকম মাতালকে।

আমেরিকা, তুমি বুঝতে পারছো না-
নির্বান্ধবতার অন্ধ আবর্তের দিকে
কীভাবে ক্রমশ ধাবিত হচ্ছো তুমি।

আমেরিকা, তুমি বুঝতে পারছো না –
কীভাবে ক্রমশ তুমি পরিণত হচ্ছো
পাপ আর অন্যায়ের উৎসভূমিতে?

প্রপিতামহের সঙ্গে জোট বেঁধে –
জাতিসংঘকে বৃদ্ধ আঙ্গুল দেখিয়ে,

ধর্মনিরপেক্ষ ইরাককে ধ্বংস করে
তুমি তোমার নিজের গণ

বিধ্বংসী
দৈত্যমূর্তিকেই উলঙ্গ করেছো।

সাদ্দাম হোসেনের পুত্ররা
কী ক্ষতি করেছিল বুশ-কন্যাদের?
তুমি তাদের হত্যা করেছো কেন?

আফগানিস্তান ও ইরাকের অগণিত
শিশু-নারী আর নিরীহ মানুষকে
তুমি হত্যা করেছো -, তুমি খুনি।

তুমি বিন-লাদেনকে শিখন্ডি বানিয়ে
বিশ্বগ্রাসের যে নাটক সাজিয়েছো,
নিপাতনে সিদ্ধ হবে তার যবনিকা।

মানুষকে সহজেই বধ করা সম্ভব,
কিন্তু ভয় দেখিয়ে – মানুষ কেন?
কুকুরকেও বশ করা যায় না।
ভয় হচেছ ভূতের এজেন্ডা,
ইমপিরিলিজমের লিগেসি।

আমেরিকা, তুমি শোনো, আমি চাই -
তুমি রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়ো,
আর সদাপ্রভু দয়াল যিশুর নামে
শুদ্ধচিত্তে তুমি পাঠ করো বাইবেল।

ট্রিলিয়ন-বিলিয়ন ডলার খরচ করে
যে লৌহবাসর তৈরি করছো তুমি-
তাতে,- তাতে আর যাই থাক,
মিলনের আনন্দ থাকবে না।
আমেরিকা, তুমি একা হয়ে যাবে,
একা হয়ে যাবে,-বড় বেশি একা।

অ্যালেন গিন্সবার্গ বেঁচে থাকলে
এ কথাই তোমাকে বলতেন;
আর দুঃখ পেতেন বুশের বিজয়ে।

আকাশ | নির্মলেন্দু গুন

আকাশ
নির্মলেন্দু গুন

**********************

আমার সমস্ত ভাবনা যখন তোমাকে ছোঁয়,
আমার সমস্ত উপলব্ধি যখন তোমার
আত্মাকে স্পর্শ করে, আমার সমস্ত বোধ
যখন তোমার বোধিতে নিমজ্জিত হয়,
তখন আমার প্রাণের গভীর থেকে
স্বতঃস্ফূর্ত মোহন মন্ত্রের মতো উচ্চারিত হয়
একটি অত্যন্ত সহজ শব্দ…”আকাশ” ।

আমি শব্দটিকে ক্রমাগত উচ্চারণ করি ।
জানি না কেন এ শব্দটিই শুধু
এত বারবার ঘুরে ঘুরে আসে ।
জানি না কী পেয়েছে সে আমার ভিতরে?
আমি লক্ষ্য করেছি, ‘আকাশ’ শব্দটি
উচ্চারিত হওয়ার পরে আমার ভিতরে
আর কোন কষ্টই অবশিষ্ট থাকে না ।
যেন যুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত বুলেটের মতো
আমার বুকের ভিতরে গেঁথে ছিল
এই যন্ত্রণাক্ত আকাশ শব্দটি ।

তোমার আমার মাঝে আছে এরকম
অনেক আকাশ । – আমি
ব্যর্থ প্রেমিকের মতো মুগ্ধমূর্খচোখে
কেবল তাকিয়ে থাকি আকাশের দিকে ।

একটি হারানো প্রেম | নির্মলেন্দু গুণ

একটি হারানো প্রেম
নির্মলেন্দু গুণ
*************************

তুমি যখন ফুল কুড়াতে যেতে
পুকুর-পাড়ে বকুল গাছের তলে,

আমি তোমায় ঝরা বকুল সেজে
টেনে নিতেম পুকুরভরা জলে।

তুমি বুঝতে পারতে না সেই খেলা,
বকুলবেশে ডাক দিয়েছে কে যে!

তখন তুমি সাঁতারও জানতে না।
তোমার প্রণয় ভিক্ষা পাব ভেবে,
আমি তোমায় দীক্ষা দিয়েছিলাম।

তুমি এখন নিজেই বকুল গাছ,
তৈরি হচ্ছো ফুল ফোটাবে বলে।
তাইতো তুমি আগের মতন আর
আসো না ওই বকুল গাছের তলে।

আসবে কেন? আসবে কেন তুমি?
ফুল কখনও ফুল কুড়াতে আসে?
বকুল এখন তোমার পায়ে লোটে,
হাজার পুরুষ তোমায় ভালোবাসে।

বকুল গাছটি অমনি আছে আজও,
পুকুরটিও রয়েছে সেইখানে−।
তুমিই শুধু নেই সকালের মতো
বদলে গেছে তোমার সকল মানে।

তুমি এখন সন্তরণে পটু−,
আমি ভুলে গেছি সাঁতার কাটা।
বকুল ফুলের গন্ধ এখন কটু,
আমার পথে পাথর এবং কাঁটা।

বকুল ভালোবাসবে কেন তুমি?
ছোট্ট পুকুর এখন অথৈ সাগর,
বকুলতলা স্নৃতির বেলাভুমি।

আমার জন্ম | নির্মলেন্দু গুণ

আমার জন্ম
নির্মলেন্দু গুণ

********************************


তপ শেষে যখন বাল্মীকি তাঁর মুদিত নয়ন
খুলিলেন, দেখিলেন লব নেই; চোখের সমুখে
দিগন্তবিস্তৃত ধু-ধু শূন্য তপোবন প’ড়ে আছে৷
‘কোথা লব, কোথা লব? ফিরে আয়৷’ ডাকিলেন মুনি,
ফিরে এলো প্রতিধ্বনি, শিশু লব দিলো না উত্তর৷
এ কোন্ বিধির লীলা, ভাবিলেন চিন্তক্লীষ্ট মুনি:
‘শুন্য হাতে কী মুখে যাইব আজ সেই পূণ্যাশ্রমে,
– যেখানে অকল্পনীয় লব-হীন সীতার জীবন৷’
যোগসিদ্ধ ঋষি তিনি, দৈববিদ্যা করায়ত্ত তাঁর,
যদি সেই তপলব্ধ দৈবজ্ঞান করিলে প্রয়োগ
মাতৃকোল পূর্ণ হয়, তৃপ্ত করে সীতার হদৃয়–
তবে তাই হোক–, মহামন্ত্রে জন্ম নিল দেবশিশু৷
পেলো প্রাণ-চঞ্চলতা অবিকল লবের মতোন৷
যেহেতু নির্মিত কুশে, তার নাম রাখা হলো কুশ৷
না আমি নির্মিত নই বাল্মীকির কাল্পনিক কুশে,
আমাকে দিয়েছে জন্ম রক্তঝরা অমর একুশে৷

নাস্তিক | নির্মলেন্দু গুণ

নাস্তিক
নির্মলেন্দু গুণ

**************************

নেই স্বর্গলোভ কিংবা কল্প-নরকের ভয়,
অলীক সাফল্যমুক্ত কর্মময় পৃথিবী আমার৷
চর্মচোখে যা যা দেখি, শারীরিক ইন্দ্রিয় যা ধরে,
তাকেই গ্রহন করি৷ জানি, নিরাকার অপ্রত্যক্ষ
শুধুই ছলনা, বিশ্বাস করি না ভাগ্যে, দেবতার বরে৷
আমার জগত্ মুগ্ধ বাস্তবের বস্তুপুঞ্জে ঠাসা,
তাই সে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য, অতীন্দ্রিয় নয়৷
অন্ধতার বধ্যভূমি আমার হদৃয়৷
সেই শ্রেষ্ঠ মানব-সন্তান, যার মন মুক্ত ভগবান৷
আমার মস্তক নিত্য নত সেই নাস্তিকের তরে৷

নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ | নির্মলেন্দু গুণ

নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ
নির্মলেন্দু গুণ

****************************************


নেকাব্বর জানে তাঁর সম্পত্তির হিসাব চাইতে আসবে না
কেউ কোনোদিন।
এই জন্মে শুধু একবার চেয়েছিল একজন, 'কী কইরা
পালবা আমারে,

তোমার কী আছে কিছু তেনা?'
সন্ধ্যায় নদীর ঘাটে ফাতেমাকে জড়িয়ে দু'হাতে বুকে পিষে
বলেছিল নেকাব্বর;

'আছে, আছে, লোহার চাককার মতো দুটা হাত,
গতরে আত্তীর বল - আর কীডা চাস্ মাগী।'
'তুমি বুঝি খাবা কলাগাছ?'

আজ এই গোধুলিবেলায় প্রচন্ড ক্ষুধার জ্বালা চোখে নিয়ে
নেকাব্বর সহসা তাকালো ফিরে সেই কলাবাগানের গাঢ় অন্ধকারে।
তিরিশ বছর পরে আজ বুঝি সত্য হলো ফাতেমার মিষ্টি উপহাস।
পাকস্থলি জ্বলে ওঠে ক্ষুধার আগুনে, মনে হয় গিলে খায়
সাজানো কদলীবন,'
যদি ফের ফিরে পায় এতটুকু শক্তি দুটি হাতে, যদি পায়
দাঁড়াবার মতো এতটুকু শক্তি দুটি পায়ে।

কিন্তু সে কি ফিরে পাবে ফের?
ফাতেমার মতো ফাঁকি দিয়া সময় গিয়েছে ঢের চলে।
কারা যেন ভুলিয়ে ভালিয়ে নিয়ে গেছে সব শক্তি তার।
বিনিময়ে দিয়ে দেছে ব্যাধি, জরা, দুর্বলতা, বক্ষে ক্ষয়কাশ-
অনাদরে, অনাহারে কবরে ডুবেছে সূর্য, ফাতেমার তিরিশ বছর।
এখন কোথায় যাবে নেকাব্বর?

হয়তো গিলেছে নদী তার শেষ ভিটেখানি, কবর ফাতেমা-
কিন্তু তার শ্রম. তার দেহবল, তার অকৃত্রিম নিষ্ঠা কারা নিলো?
আজ এই গোধুলিবেলায় এই যে আমার পৃথিবীকে মনে হলো পাপ,
মনে হলো হাবিয়া দোজখ - কেউ কি নেবে না তার এতটুকু দায়?
মানুষ পৃথিবী ছেড়ে চায় না সুদুরে চলে যেতে, নেকাব্বর ভাবে,
অজানা অচেনা স্বর্গে বুঝি মেটে বাস্তবের তৃষ্ণা কোনোদিন?
তবু যারা চায়, তারা কেন চায়? তারা কেন চায়? কেন চায়?

নেকাব্বর শুয়ে আছে জীবনের শেষ ইস্টিশনে। তার পচা বাসী শব
ঘিরে আছে সাংবাদিক দল। কেউ বলে অনাহারে, কেউ বলে অপুষ্টিতে,
কেউ বলে বার্ধক্যজনিত ব্যাধি, - নেকাব্বর কিছুই বলে না।

November 10, 2011

শুধু তোমার জন্য | নির্মলেন্দু গুণ

শুধু তোমার জন্য
নির্মলেন্দু গুণ

********************************

কতবার যে আমি তোমোকে স্পর্শ করতে গিয়ে
গুটিয়ে নিয়েছি হাত-সে কথা ঈশ্বর জানেন।
তোমাকে ভালোবাসার কথা বলতে গিয়েও
কতবার যে আমি সে কথা বলিনি
সে কথা আমার ঈশ্বর জানেন।
তোমার হাতের মৃদু কড়ানাড়ার শব্দ শুনে জেগে উঠবার জন্য
দরোজার সঙ্গে চুম্বকের মতো আমি গেঁথে রেখেছিলাম
আমার কর্ণযুগল; তুমি এসে আমাকে ডেকে বলবেঃ
‘এই ওঠো,
আমি, আ…মি…।‘
আর অমি এ-কী শুনলাম
এমত উল্লাসে নিজেকে নিক্ষেপ করবো তোমার উদ্দেশ্যে
কতবার যে এরকম একটি দৃশ্যের কথা আমি মনে মনে
কল্পনা করেছি, সে-কথা আমার ঈশ্বর জানেন।
আমার চুল পেকেছে তোমার জন্য,
আমার গায়ে জ্বর এসেছে তোমার জন্য,
আমার ঈশ্বর জানেন- আমার মৃত্যু হবে তোমার জন্য।
তারপর অনেকদিন পর একদিন তুমিও জানবে,
আমি জন্মেছিলাম তোমার জন্য। শুধু তোমার জন্য।

November 04, 2011

আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি | নির্মলেন্দু গুণ

আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি
নির্মলেন্দু গুণ

************************************


সমবেত সকলের মতো আমিও গোলাপ ফুল খুব ভালোবাসি,
রেসকোর্স পার হ’য়ে যেতে সেইসব গোলাপের একটি গোলাপ
গতকাল আমাকে বলেছে, আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।
আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।

শহীদ মিনার থেকে খ’সে পড়া একটি রক্তাক্ত ইট গতকাল আমাকে বলেছে
আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।
আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।

সমবেত সকলের মতো আমিও পলাশ ফুল খুব ভালোবাসি, ‘সমকাল’
পার হয়ে যেতে যেতে সদ্যফোটা একটি পলাশ গতকাল কানে কানে
আমাকে বলেছে, আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।
আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।

শাহবাগ এ্যভিন্যুর ঘূর্ণায়িত জলের ঝর্ণাটি আর্তস্বরে আমাকে বলেছে
আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।
আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।

সমবেত সকলের মতো আমারো স্বপ্নের প্রতি পক্ষপাত আছে,
ভালোবাসা আছে শেষ রাতে দেখা একটি সাহসী স্বপ্ন গতকাল
আমাকে বলেছে, আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।
আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।

এই বসন্তের বটমূলে সমবেত ব্যথিত মানুষগুলো সাক্ষী থাকুক,
না-ফোটা কৃষ্ণচূড়ার শুষ্কভগ্ন অপ্রস্তুত প্রাণের ঐ গোপন মঞ্জরীগুলো
কান পেতে শুনুক,
আসন্ন সন্ধ্যায় এই কালো কোকিলটি জেনে যাক -
আমার পায়ের তলার পুণ্য মাটি ছুঁয়ে
আমি আজ সেই গোলাপের কথা রাখলাম, আজ সেই পলাশের কথা
রাখলাম, আজ সে স্বপ্নের কথা রাখলাম।

আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি,
আমি আমার ভালোবাসার কথা বলতে এসেছিলাম।

একটি হারানো প্রেম | নির্মলেন্দু গুণ

একটি হারানো প্রেম
নির্মলেন্দু গুণ

*************************


তুমি যখন ফুল কুড়াতে যেতে
পুকুর-পাড়ে বকুল গাছের তলে,

আমি তোমায় ঝরা বকুল সেজে
টেনে নিতেম পুকুরভরা জলে।

তুমি বুঝতে পারতে না সেই খেলা,
বকুলবেশে ডাক দিয়েছে কে যে!

তখন তুমি সাঁতারও জানতে না।
তোমার প্রণয় ভিক্ষা পাব ভেবে,
আমি তোমায় দীক্ষা দিয়েছিলাম।

তুমি এখন নিজেই বকুল গাছ,
তৈরি হচ্ছো ফুল ফোটাবে বলে।
তাইতো তুমি আগের মতন আর
আসো না ওই বকুল গাছের তলে।

আসবে কেন? আসবে কেন তুমি?
ফুল কখনও ফুল কুড়াতে আসে?
বকুল এখন তোমার পায়ে লোটে,
হাজার পুরুষ তোমায় ভালোবাসে।

বকুল গাছটি অমনি আছে আজও,
পুকুরটিও রয়েছে সেইখানে−।
তুমিই শুধু নেই সকালের মতো
বদলে গেছে তোমার সকল মানে।

তুমি এখন সন্তরণে পটু−,
আমি ভুলে গেছি সাঁতার কাটা।
বকুল ফুলের গন্ধ এখন কটু,
আমার পথে পাথর এবং কাঁটা।

বকুল ভালোবাসবে কেন তুমি?
ছোট্ট পুকুর এখন অথৈ সাগর,
বকুলতলা স্নৃতির বেলাভুমি।

যাত্রা-ভঙ্গ | নির্মলেন্দু গুণ

যাত্রা-ভঙ্গ
নির্মলেন্দু গুণ

****************


হাত বাড়িয়ে ছুঁই না তোকে,
মন বাড়িয়ে ছুঁই,
দুইকে আমি এক করি না
এক কে করি দুই৷
হেমের মাঝে শুই না যবে,
প্রেমের মাঝে শুই
তুই কেমন করে যাবি?
পা বাড়ালেই পায়ের ছায়া
আমাকেই তুই পাবি৷
তবুও তুই বলিস যদি যাই,
দেখবি তোর সমুখে পথ নাই৷
তখন আমি একটু ছোঁব,
হাত বাড়িয়ে জাড়াব তোর
বিদায় দুটি পায়ে,
তুই উঠবি আমার নায়ে,
আমার বৈতরনী নায়ে৷
নায়ের মাঝে বসব বটে,
না-এর মাঝে শোব৷
হাত দিয়েতো ছোঁব না মুখ,
দু:খ দিয়ে ছোঁব৷
তুই কেমন করে যাবি?

তোমার চোখ এতো লাল কেন | নির্মলেন্দু গুণ

তোমার চোখ এতো লাল কেন
নির্মলেন্দু গুণ

**************************

আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে , আমি চাই
কেউ একজন আমার জন্য অপেক্ষা করুক,
শুধু ঘরের ভেতর থেকে দরোজা খুলে দেবার জন্য ।
বাইরে থেকে দরোজা খুলতে খুলতে আমি এখন ক্লান্ত ।

আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই
কেউ আমাকে খেতে দিক । আমি হাতপাখা নিয়ে
কাউকে আমার পাশে বসে থাকতে বলছি না,
আমি জানি, এই ইলেকট্রিকের যুগ
নারীকে মুক্তি দিয়েছে স্বামী -সেবার দায় থেকে ।
আমি চাই কেউ একজন জিজ্ঞেস করুক :
আমার জল লাগবে কি না, নুন লাগবে কি না,
পাটশাক ভাজার সঙ্গে আরও একটা
তেলে ভাজা শুকনো মরিচ লাগবে কি না ।
এঁটো বাসন, গেঞ্জি-রুমাল আমি নিজেই ধুতে পারি ।

আমি বলছি না ভলোবাসতেই হবে, আমি চাই
কেউ একজন ভিতর থেকে আমার ঘরের দরোজা
খুলে দিক । কেউ আমাকে কিছু খেতে বলুক ।
কাম-বাসনার সঙ্গী না হোক, কেউ অন্তত আমাকে
জিজ্ঞেস করুক : 'তোমার চোখ এতো লাল কেন ?'

আগ্নেয়াস্ত্র | নির্মলেন্দু গুণ

আগ্নেয়াস্ত্র
নির্মলেন্দু গুণ

**************************


পুলিশ স্টেশনে ভিড়,আগ্নেয়াস্ত্র জমা নিচ্ছে শহরের
সন্দিগ্ধ সৈনিক। সামরিক নির্দেশে ভীত মানুষের
শটগান, রাইফেল, পিস্তল এবং কার্তুজ, যেন দরগার
স্বীকৃত মানৎ; টেবিলে ফুলের মতো মস্তানের হাত।
আমি শুধু সামরিক আদেশ অমান্য করে হয়ে গেছি
কোমল বিদ্রোহী, প্রকাশ্যে ফিরছি ঘরে
অথচ আমার সঙ্গে হৃদয়ের মতো মারাত্মক
একটি আগ্নেয়াস্ত্র,আমি জমা দেই নি।

মানুষ | নির্মলেন্দু গুণ

মানুষ
নির্মলেন্দু গুণ

***********************



আমি হয়তো মানুষ নই, মানুষগুলো অন্যরকম,
হাঁটতে পারে, বসতে পারে, এ-ঘর থেকে ও-ঘরে যায়,
মানুষগুলো অন্যরকম, সাপে কাটলে দৌড়ে পালায় ।

আমি হয়তো মানুষ নই, সারাটা দিন দাঁড়িয়ে থাকি,
গাছের মতো দাঁড়িয়ে থাকি।
সাপে কাটলে টের পাই না, সিনেমা দেখে গান গাই না,
অনেকদিন বরফমাখা জল খাই না ।
কী করে তfও বেঁচে থাকছি, ছবি আঁকছি,
সকালবেলা, দুপুরবেলা অবাক করে
সারাটা দিন বেঁচেই আছি আমার মতে । অবাক লাগে ।


আমি হয়তো মানুষ নই, মানুষ হলে জুতো থাকতো,
বাড়ি থাকতো, ঘর থাকতো,
রাত্রিবেলায় ঘরের মধ্যে নারী থাকতো,
পেটের পটে আমার কালো শিশু আঁকতো ।


আমি হয়তো মানুষ নই,
মানুষ হলে আকাশ দেখে হাসবো কেন ?
মানুষগুলো অন্যরকম, হাত থাকবে,
নাক থাকবে, তোমার মতো চোখ থাকবে,
নিকেলমাখা কী সুন্দর চোখ থাকবে
ভালোবাসার কথা দিলেই কথা রাখবে ।


মানুষ হলে উরুর মধ্যে দাগ থাকতো ,
বাবা থাকতো, বোন থাকতো,
ভালোবাসার লোক থাকতো,
হঠাৎ করে মরে যাবার ভয় থাকতো ।


আমি হয়তো মানুষ নই,
মানুষ হলে তোমাকে নিয়ে কবিতা লেখা
আর হতো না, তোমাকে ছাড়া সারাটা রাত
বেঁচে থাকাটা আর হতো না ।

মানুষগুলো সাপে কাটলে দৌড়ে পালায় ;
অথচ আমি সাপ দেখলে এগিয়ে যাই, অবহেলায় মানুষ ভেবে জাপটে ধরি

আমার জন্ম | নির্মলেন্দু গুণ

আমার জন্ম
নির্মলেন্দু গুণ

***********************


তপ শেষে যখন বাল্মীকি তাঁর মুদিত নয়ন
খুলিলেন, দেখিলেন লব নেই; চোখের সমুখে
দিগন্তবিস্তৃত ধু-ধু শূন্য তপোবন প’ড়ে আছে৷
‘কোথা লব, কোথা লব? ফিরে আয়৷’ ডাকিলেন মুনি,
ফিরে এলো প্রতিধ্বনি, শিশু লব দিলো না উত্তর৷
এ কোন্ বিধির লীলা, ভাবিলেন চিন্তক্লীষ্ট মুনি:
‘শুন্য হাতে কী মুখে যাইব আজ সেই পূণ্যাশ্রমে,
– যেখানে অকল্পনীয় লব-হীন সীতার জীবন৷’
যোগসিদ্ধ ঋষি তিনি, দৈববিদ্যা করায়ত্ত তাঁর,
যদি সেই তপলব্ধ দৈবজ্ঞান করিলে প্রয়োগ
মাতৃকোল পূর্ণ হয়, তৃপ্ত করে সীতার হদৃয়–
তবে তাই হোক–, মহামন্ত্রে জন্ম নিল দেবশিশু৷
পেলো প্রাণ-চঞ্চলতা অবিকল লবের মতোন৷
যেহেতু নির্মিত কুশে, তার নাম রাখা হলো কুশ৷
না আমি নির্মিত নই বাল্মীকির কাল্পনিক কুশে,
আমাকে দিয়েছে জন্ম রক্তঝরা অমর একুশে৷

November 03, 2011

এবারই প্রথম তুমি | নির্মলেন্দু গুণ

এবারই প্রথম তুমি
নির্মলেন্দু গুণ

****************


ভুলে যাও তুমি পূর্বেও ছিলে
মনে করো এই বিশ্ব নিখিলে
এবারই প্রথম তুমি৷
এর আগে তুমি কোথাও ছিলে না
ছিলে না আকাশে, নদী জলে ঘাসে
ছিলে না পাথরে ঝর্ণার পাশে৷
এবারই প্রথম তুমি৷
এর আগে তুমি কিছুতে ছিলে না৷
ফুলেও ছিলে না, ফলেও ছিলে না
নাকে মুখে চোখে চুলেও ছিলে না৷
এবারই প্রথম তুমি৷
এর আগে তুমি এখানে ছিলে না
এর আগে তুমি সেখানে ছিলে না
এর আগে তুমি কোথাও ছিলে না৷
এবারই প্রথম তুমি৷
রাতের পুণ্য লগনে ছিলে না
নীল নবঘন গগনে ছিলে না৷
এবারই প্রথম তুমি৷
এর আগে তুমি তুমিও ছিলে না৷
এবারই প্রথম তুমি৷